আঠারাে শতকে রাজাদের বাসস্থান হিসেবে নির্মিত হয় নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি। ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নাটোর সদর উপজেলাধীন দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির নামকরণ করেন উত্তরা গণভবন। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সেই নামকরণের ৫০ বছর পূর্তি বা সুবর্ণজয়ন্তী হয়।
ইতিহাসে উত্তরা গণভবন
প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন দিঘাপতিয়া রাজবাড়িটি নাটোরের উত্তরা গণভবন হিসেবে পরিচিত। দিঘাপতিয়া রাজবংশের পত্তন ঘটান নাটোরের রাজা রামজীবন-এর অনুগত এবং বিশ্বস্ত দেওয়ান দয়ারাম রায়। রাজার উত্থানের পিছনেও দয়ারামের অনেক ভূমিকা ছিল।
১৭১৪ সালে যশােরের ভূষণার জমিদার সীতারাম রায়ের পতনের মূলেও ছিল দয়ারাম রায়ের কূটকৌশল। জমিদারি পরিচালনায় দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার পুরস্কারস্বরূপ নাটোরের রাজা। রামজীবন দয়ারামকে পরগনা ভাতুরিয়ার তরফ নন্দকুজা, যশাের জেলার মহল কালনা, পাবনা জেলার তরফ সেলিমপুর এবং বগুড়া ও জামালপুর জেলার নওখােলা দান করেন। ১৭৩৪ সালে নির্মিত হয় দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদ। রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদা নাথ রায়।
১০ জুন ১৮৯৭ নাটোরের ডােমপাড়া মাঠে তিন। দিনব্যাপী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের এক অধিবেশনের আয়ােজন করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি এ অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যােগ দেন। অধিবেশনের শেষদিন ১২ জুন এক প্রলয়ংকারী ভূমিকম্পে রাজপ্রাসাদটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। পরে রাজা প্রমদা নাথ রায় ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছর সময় ধরে বিদেশি।
আরো পড়ুন
- ক্লিফ অব মােহর সম্পর্কিত তথ্য
- বিশ্বের ৯টি আশ্চর্যজনক ঘটনা
- পুলিৎজার পুরস্কার ২০২২
- জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২
- রিজার্ভ চুরির মামলায় দুই প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি
- ডিজিটাল পদ্ধতিতে জনশুমারি
- ডায়াবেটিসের নতুন কারণ
- দারকিনা মাছের প্রজনন উদ্ভাবন
- পদ্মার পাড়ে শেখ রাসেল সেনানিবাস
- বঙ্গবন্ধু লাইভ ম্যাংগাে মিউজিয়াম
বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও চিত্রকর্ম শিল্পী আর দেশি কারিগরদের সহায়তায় ৪১.৫০ একর জমির ওপর এ রাজবাড়িটি নতুনভাবে। নির্মাণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাস হওয়ার পর শেষ রাজা প্রতিভানাথ। ১৯৫২ সালে সপরিবারে কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৫২-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দিঘাপতিয়া রাজবাড়িটি পরিত্যক্ত থাকে।
নামকরণ করা
১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গণপূর্ত বিভাগ প্রায় ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে দিঘাপতিয়া রাজবাড়িটি সংস্কার করে। তখন এটি ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউসে পরিণত হয়। ২৪ জুলাই ১৯৬৭ তকালীন গভর্নর মােনায়েম খান এটিকে গভর্নর হাউস’ হিসেবে উদ্বোধন করেন। ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নাটোর সফরে এসে দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদকে ‘উত্তরা গণভবন’ নামকরণ করেন। তিনি তার মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে গণভবনে বৈঠকও করেন। এরপর থেকে উত্তরা গণভবন ঢাকার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে পরিচিতি পায়।
মন্ত্রিসভার বৈঠক
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু উত্তরা গণভবনের মূল প্রাসাদের ভেতরে মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক করেন। পরবর্তীতে অন্যান্য সরকারের আমলেও সেখানে অন্তত একবার বৈঠক হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলগুলাের কাছে এটি রেওয়াজ হয়ে দাঁড়ায়। ১৭ নভেম্বর ১৯৮০ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজধানীর বাইরে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন উত্তরা গণভবনে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভাও উত্তরা গণভবনে বৈঠক করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার প্রথম মেয়াদে ২১ জানুয়ারি ১৯৯২ ও দ্বিতীয় মেয়াদে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০১ উত্তরা গণভবনে বৈঠক করে।
শতবর্ষে ঐতিহাসিক সলঙ্গা বিদ্রোহ
১৩ এপ্রিল ১৯১৯ পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ঘটেছিল ইতিহাসের এক নৃশংস গণহত্যা। জালিয়ানওয়ালাবাগের পথ ধরে ব্রিটিশ বেনিয়াদের নৃশংসতার আরেক রক্তাক্ত অধ্যায় রচিত হয় সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায়। দিনটি ছিল ২৭ জানুয়ারি ১৯২২। ব্রিটিশবিরােধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে সলঙ্গা বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। ভারতবর্ষের বিলেতি পণ্য বর্জন আন্দোলনের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে সলঙ্গায়। সে সময় সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় সপ্তাহে ২ দিন হাট বসত। ২৭ জানুয়ারি ১৯২২ শুক্রবার ছিল বড় হাটের দিন।
মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে অসহযােগ ও খেলাফত আন্দোলনের কর্মীরা বিলেতি পণ্য কেনাবেচা বন্ধ করতে হাটে নামে। আর এই স্বদেশি আন্দোলনের কর্মীদের রুখতে ছুটে আসেন পাবনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর. এন. দাস, জেলা পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমার প্রশাসক এস কে সিনহাসহ ৪০জন সশস্ত্র লাল পাগড়িওয়ালা পুলিশ।
সলঙ্গার গাে হাটায় ছিল বিপ্লবী স্বদেশি কর্মীদের অফিস। পুলিশ অফিস ঘেরাও পূর্বক গ্রেপ্তার করে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কৰ্বাগীশকে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে মুক্ত করতে সেদিন ব্রিটিশবিরােধী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সলঙ্গার। ৪০,০০০ সগ্রামী জনতা। জনতার ঢল ও আক্রোশ দেখে ম্যাজিস্ট্রেট জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশকে গুলি চালাতে নির্দেশ দেন। শুরু হয়ে যায় বুলেট বৃষ্টি। এতে সলঙ্গার হাটে ৪,৫০০ সাধারণ হাটুরে জনতা শহীদ হন।